সম্পাদকীয়
উত্তর হারবাংয়ের সেই রক্তাক্ত দিনটি এখনো ভুলে যায়নি মানুষ। তিন সাংবাদিকের ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো বর্বর হামলা, রড-লাঠির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়া মানুষ, আর সেই ঘটনার ভিডিও ও বর্ণনা এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষের স্মৃতিতে।
কিন্তু বিস্ময়করভাবে, সেই মামলার ৬ আসামিকে জামিন দিয়েছেন চকরিয়া জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালত।
আইন তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় চলে—এ কথা সত্য। কিন্তু যখন একটি ঘটনায় সাংবাদিকদের ওপর প্রকাশ্য হামলার অভিযোগ ওঠে, যখন আহতদের কেউ এখনো চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে লড়ছেন, তখন এমন সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে।
প্রশ্নটি শুধু আইনি নয়, নৈতিকও।
যে ঘটনায় হত্যার উদ্দেশ্যে হামলার অভিযোগ, যেখানে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সংগঠিত সন্ত্রাসী হামলার কথা বলা হচ্ছে—সেখানে এত দ্রুত জামিন কী বার্তা দেয়? এই বার্তা কি সেই সাহস জোগায় না, যারা মনে করে শক্তি আর প্রভাব থাকলে আইনের ভয় নেই?
সাংবাদিকরা কোনো ব্যক্তিগত লড়াইয়ে নামেননি। তারা গিয়েছিলেন তথ্য সংগ্রহ করতে, জনস্বার্থের বিষয় তুলে ধরতে। আর সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি তাদের ওপর হামলা হয়, আর অভিযুক্তরা সহজে মুক্ত বাতাসে হাঁটতে পারেন—তাহলে সেটি শুধু একটি মামলার বিষয় থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে গণমাধ্যমের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
এখানে কেউ বিচারকে প্রভাবিত করতে চায় না। আদালতের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু একই সঙ্গে মানুষের মনে যে প্রশ্ন জেগেছে, সেই প্রশ্নও অস্বীকার করার উপায় নেই।
হামলার শিকার সাংবাদিকরা এখনো শারীরিক ও মানসিক আঘাত নিয়ে লড়ছেন। আর অভিযুক্তদের জামিনের খবরে সাংবাদিক সমাজে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা অস্বাভাবিক নয়।
কারণ মানুষ দেখতে চায়—আইনের শাসন কাগজে নয়, বাস্তবেও আছে।
উত্তর হারবাংয়ের এই ঘটনা এখন একটি বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি দেখিয়ে দেবে—সত্য তুলে ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হলে সাংবাদিকরা কতটা নিরাপত্তা পায়, আর আইনের চোখে সেই অপরাধ কতটা গুরুত্ব পায়।
ন্যায়বিচার শুধু হওয়াই যথেষ্ট নয়, তা দৃশ্যমানও হতে হয়।
না হলে মানুষের মনে সন্দেহ জন্মায়—আইনের পাল্লা কি সত্যিই সমান?
এই মুহূর্তে প্রয়োজন একটি স্পষ্ট বার্তা—
হামলা, সন্ত্রাস এবং ভয় দেখিয়ে সত্যকে থামানো যাবে না।
কারণ সাংবাদিকের কলম থামিয়ে দিলে শুধু একজন মানুষ নীরব হয় না; নীরব হয়ে যায় সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ।
আর সেই নীরবতা কোনো সভ্য সমাজের জন্য শুভ সংকেত নয়।

আরো পড়ুন
কক্সবাজার—অদৃশ্য দখলের মুখে এক জনপদ
বালুর নামে লুট—রাষ্ট্রের কোষাগার কার জন্য?
মসজিদের পবিত্রতা বনাম উৎসবের পরিসর—সংযমই সমাধান