বালুর নামে লুট—রাষ্ট্রের কোষাগার কার জন্য?
সম্পাদকীয়
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর সংযোগ সড়ক প্রকল্প ঘিরে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা প্রকল্পের অনিয়ম এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। হাজার হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে বালু সরবরাহকে কেন্দ্র করে যেভাবে সরকারি রাজস্ব বেসরকারি পকেটে যাওয়ার পথ তৈরি করা হয়েছে, তা উদ্বেগজনক ও অগ্রহণযোগ্য।
প্রথম প্রশ্নটি খুব সরল: কেন কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলো?
উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক। সেখানে এই মৌলিক নিয়ম উপেক্ষা করা মানেই প্রশ্নের জন্ম দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, বালুর মূল্য নির্ধারণে যে অস্বাভাবিক অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে, তা আরও বড় সংকেত দেয়। যেখানে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা প্রতি ঘনফুট বালুর দাম ১৬ টাকার বেশি প্রস্তাব করেছে, সেখানে তা কমিয়ে ৬ টাকা ৯৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর চেয়েও বিস্ময়কর—বালু উত্তোলনের খরচও সরকার বহন করবে! অর্থাৎ লাভ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের, আর ব্যয় জনগণের টাকায়। এই সমীকরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটি একদিকে অর্থনৈতিক অপচয়, অন্যদিকে পরিবেশগত দিক থেকেও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। উপকূলীয় ভারসাম্য নষ্ট হলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।
প্রশাসনের বক্তব্যে যে অস্পষ্টতা ও দায় এড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেটিও হতাশাজনক। জেলা প্রশাসন বলছে তারা পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানে না, প্রকল্প পরিচালক নীরব—এ যেন দায়িত্বহীনতার এক অদ্ভুত সমন্বয়। একটি বড় প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি মৌলিক তথ্যই না জানে, তাহলে সিদ্ধান্তগুলো কিভাবে নেওয়া হচ্ছে?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এখানে একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে কম দামে বালু দেখিয়ে বেশি দামে ক্রয় দেখানো, পরিবহন ব্যয়সহ অস্বাভাবিক বিল তৈরি করে বিপুল অর্থ আত্মসাতের সুযোগ রাখা হয়েছে। যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি ব্যাপক দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রের সম্পদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধ।
এখন প্রশ্ন—এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী?
প্রথমত, পুরো প্রক্রিয়াটি অবিলম্বে স্থগিত করে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় বালু সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ধরনের উত্তোলন কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
চতুর্থত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় এনে দায় নির্ধারণ করতে হবে।
উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়; উন্নয়ন মানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা। যদি উন্নয়নের নামে লুটপাটের সংস্কৃতি চালু থাকে, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না—বরং তা জনআস্থার ভিত্তিকে ধ্বংস করে।
রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের। সেই সম্পদ যদি কৌশলে কিছু গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হয়, তবে তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি নৈতিক পরাজয়ও। এখন সময় এসেছে, এই প্রবণতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার।

আরো পড়ুন
মসজিদের পবিত্রতা বনাম উৎসবের পরিসর—সংযমই সমাধান
রামুতে দ্বিমুখী বাস্তবতা: মাদকবিরোধী সাফল্য, নাকি আস্থার গভীর সংকট?
কুতুপালং বাজার ইজারা, না রাস্তা দখলের বৈধতা?