Daily Alokito Ukhiya

Online Edition of The Daily Alokito Ukhiya

কক্সবাজার—অদৃশ্য দখলের মুখে এক জনপদ

সম্পাদকীয়ঃ
কক্সবাজারকে আমরা চিনি পর্যটনের রাজধানী হিসেবে। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে ধীরে ধীরে যে এক ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, তা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে একটি অশুভ শক্তির বিস্তার ঘটছে—যার নাম ইয়াবা অর্থনীতি।
আজ যে কথাটি অনেকের কাছে অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে, সেটিই ক্রমশ বাস্তব হয়ে উঠছে—ইয়াবার অর্থ এখন কক্সবাজারের বিভিন্ন খাতে প্রভাব বিস্তার করছে। রাজনীতি, বিনিয়োগ, ব্যবসা, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডও এই অর্থের ছায়া থেকে মুক্ত নয়। যখন অবৈধ অর্থ মূলধারার সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলে, তখন সেটি কেবল একটি অপরাধের বিষয় থাকে না; তা পরিণত হয় একটি সমান্তরাল শক্তি কাঠামোয়।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত অগ্রযাত্রা। সীমান্তবর্তী অবস্থান, দুর্বল নজরদারি এবং আঞ্চলিক অস্থিরতাকে পুঁজি করে মাদক কারবারিরা দীর্ঘমেয়াদী কৌশলে এগোচ্ছে। তাদের লক্ষ্য শুধু লাভ নয়, প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। এর ফলাফল হচ্ছে—একটি জনপদ ধীরে ধীরে ‘মাফিয়া-নির্ভর’ ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়া।
রোহিঙ্গা সংকট এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তুলেছে। আশ্রিত জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নানা কারণে মাদক পাচারে জড়িয়ে পড়ছে—যা মানবিক সংকটকে নিরাপত্তা সংকটে রূপ দিচ্ছে। একইসঙ্গে সীমান্তের ওপারে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়নে ইয়াবা একটি বড় উৎস হয়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন মহলে আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বিষয়টি আর কেবল অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নও।
এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি চিন্তার বিষয়—প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব। যখন অবৈধ অর্থ প্রশাসন বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভেতরে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। ইতিহাস বলে, একবার এই প্রক্রিয়া গভীরে প্রবেশ করলে তা প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে যায়।
বিশ্বের বিভিন্ন উদাহরণ আমাদের সতর্ক করে। লাতিন আমেরিকার কিছু দেশে মাদক কার্টেল কীভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে প্রভাবিত করেছে, তা সুপরিচিত। Mexico-এর অভিজ্ঞতা দেখায়, মাদক অর্থনীতি যদি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিস্তার লাভ করে, তবে তা আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কাঠামো পর্যন্ত গভীর প্রভাব ফেলে।
কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোন নিয়েও যে অভিযোগ ও উদ্বেগ উঠছে, তা গুরুত্বসহকারে দেখা দরকার। যদি একটি পর্যটন এলাকা ধীরে ধীরে অপরাধের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়, তবে তা শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
এই বাস্তবতায় করণীয় কী?
প্রথমত, মাদকবিরোধী অভিযানকে শুধুমাত্র ধরপাকড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর আর্থিক প্রবাহ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অর্থের উৎস ও ব্যবহারের জায়গাগুলোতে কঠোর নজরদারি জরুরি।
দ্বিতীয়ত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করতে হবে, যাতে পাচারের মূল রুটগুলো ভেঙে দেওয়া যায়।
তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বিকল্প জীবিকা, শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম বাড়াতে হবে, যাতে তারা অপরাধ চক্রের সহজ টার্গেটে পরিণত না হয়।
চতুর্থত, সাংবাদিকতা ও সামাজিক খাতকে স্বচ্ছ রাখতে নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, সমস্যাটিকে অস্বীকার না করে বাস্তবতা হিসেবে স্বীকার করতে হবে। কারণ, অদৃশ্য দখলই সবচেয়ে বিপজ্জনক—যা চোখে পড়ে না, কিন্তু একসময় পুরো কাঠামোকে গ্রাস করে ফেলে।
কক্সবাজার এখনও সময়ের মধ্যে আছে। এখনই যদি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তবে এই জনপদকে মাফিয়াতন্ত্রের কবল থেকে রক্ষা করা সম্ভব। অন্যথায়, একসময় হয়তো আমরা বুঝতেই পারব না—কখন নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে।