কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের বাহারছড়া। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সমুদ্র। এই জনপদের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে মিশে আছে সুপারি চাষ। বিশেষ করে বাহারছড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা সুপারি বাগান এখন অনেক পরিবারের নিয়মিত আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস।
টেকনাফের সুপারি স্বাদ, আকার ও মানের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে, ‘টেকনাইফ্যা সুপারি, গালত দিলে মিশ্রি।’ অর্থাৎ টেকনাফের সুপারির স্বাদ মিষ্টির মতো।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মৌসুমে টেকনাফে প্রায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার হেক্টর জমিতে সুপারি চাষের তথ্য পাওয়া যায়। বিভিন্ন বছরের হিসাবের পার্থক্য থাকলেও, বাহারছড়া ও সাবরাংসহ উপকূলীয় এলাকাগুলোতেই সুপারি উৎপাদনের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত।
বাহারছড়ায় সুপারি বাগান ঘিরে অর্থনীতি
বাহারছড়ার অনেক কৃষক একবার সুপারি গাছ লাগিয়ে দীর্ঘদিন ফলন পাচ্ছেন। অন্যান্য অনেক ফসলের তুলনায় সুপারি চাষে নিয়মিত চাষাবাদ ও উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম হওয়ায় এটি কৃষকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। একটি পরিণত গাছ থেকে প্রতি মৌসুমে কয়েক পন সুপারি পাওয়া যায়।
২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে বাহারছড়ার এক চাষি জানান, প্রায় ৬০ শতক জমিতে তাঁর ৯ শতাধিক সুপারি গাছ রয়েছে এবং প্রতিটি গাছে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০টি সুপারি ধরেছে। ওই বাগান থেকে তিনি প্রায় ৬ লাখ টাকার সুপারি বিক্রির আশা করেছিলেন।
অর্থাৎ, বড় বাগান মালিকদের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি বাগানের মালিকদের জন্যও সুপারি হয়ে উঠেছে মৌসুমি নগদ আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
শামলাপুর বাজারে জমে বড় বেচাকেনা
বাহারছড়ার শামলাপুর বাজার কক্সবাজার জেলার অন্যতম বড় পাইকারি সুপারি বাজার হিসেবে পরিচিত। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে এখানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে সুপারি কিনে নিয়ে যান।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতি হাটে বিপুল পরিমাণ সুপারি বেচাকেনা হয় এবং ট্রাকভর্তি সুপারি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়।
২০২৪ সালের কৃষি বিভাগের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজারে প্রায় ১২ হাজার ৩২০ টন সুপারি উৎপাদন হয়েছিল, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। জেলার মধ্যে টেকনাফেই উৎপাদন সবচেয়ে বেশি। বাহারছড়া ও সাবরাংয়ের সুপারির আকার ও মান ভালো হওয়ায় দামও তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়।
শুধু দেশেই নয়, যাচ্ছে বিদেশেও
টেকনাফের সুপারির বাজার এখন শুধু স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কক্সবাজারের সুপারি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও যাচ্ছে।
ফলে বাগান মালিক, স্থানীয় ব্যবসায়ী, ফড়িয়া, শ্রমিক, পরিবহন মালিক এবং পাইকারি ব্যবসায়ীসহ একটি বড় জনগোষ্ঠী এই বাণিজ্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত।
তবে রয়েছে কিছু সমস্যা
এত বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকলেও সুপারি বাজারে এখনো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট বাজার অবকাঠামোর অভাব, মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা, বাজারদরের ওঠানামা এবং সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সীমাবদ্ধতা কৃষকদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। টেকনাফ পৌর এলাকায় নির্ধারিত সুপারি বাজার না থাকায় বিভিন্ন সড়কের পাশে বেচাকেনা করার বিষয়টিও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
চাষিদের অভিযোগ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা যাচাই করে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, আধুনিক বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সুপারি সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো গেলে এই খাত আরও বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
বাহারছড়ার সুপারি বাগান তাই কেবল সবুজে ঘেরা একটি কৃষি দৃশ্য নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের আয়-রোজগার, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য এবং টেকনাফের ঐতিহ্য।
প্রশ্ন হচ্ছে, যে সুপারি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাজারে যাচ্ছে, এমনকি বিদেশেও পৌঁছাচ্ছে, সেই সুপারি চাষিদের জন্য আধুনিক বাজার, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কতটা আছে?
বাহারছড়ার সুপারি শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি সহায়তা পেলে এটি টেকনাফের গ্রামীণ অর্থনীতির আরও শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

আরো পড়ুন
সকাল ১০টার পর বন্ধ টেকনাফ মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক
কাউন্সিলর একরাম হত্যা: শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন
উখিয়া ও টেকনাফে দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাডেমিক ভবন নির্মাণে ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ