বরিশালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, দৈনিক সমকালের সাবেক বরিশাল ব্যুরো প্রধান এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার ঘিরে সাংবাদিক অঙ্গনে গভীর শোকের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর প্যারারা রোডে দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরো কার্যালয় থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্যালয়ের দরজা ভেতর থেকে আটকানো ছিল। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে দরজা খুলে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, এটি আত্মহত্যার ঘটনা। তবে তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার আগে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি চিরকূট উদ্ধারের তথ্যও সামনে এসেছে। বিডিনিউজ২৪-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিরকুটগুলোর কয়েকটিতে পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীর উদ্দেশে লেখা ছিল। একটি চিরকূটে মেয়েকে পড়াশোনা ও গান শেখা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। আরেকটিতে সমকালের কাছে পাওনা টাকা আদায় করে পরিবারকে দেওয়ার অনুরোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চিরকুটগুলোর নিচে স্বাক্ষর ও তারিখ ছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
পুলক চ্যাটার্জি দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেছেন। তিনি দৈনিক যুগান্তর ও সমকালে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং একসময় সমকালের বরিশাল ব্যুরো প্রধান ছিলেন। পরিবার ও সহকর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় দুই থেকে তিন বছর আগে সমকাল থেকে তাঁর চাকরি চলে যাওয়ার পর তিনি বেকার ছিলেন এবং মানসিক ও আর্থিক চাপের মধ্যে ছিলেন।
তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে।
একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিকের চাকরি হারানো, দীর্ঘদিন বেকার থাকা, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপ কি তাঁর মৃত্যুর পেছনে ভূমিকা রেখেছিল?
যদি চিরকুটে পাওনা অর্থের বিষয়টি সত্যিই উল্লেখ থাকে, তাহলে সেই পাওনা কত ছিল? কেন তা পরিশোধ হয়নি? চাকরি হারানোর পর তাঁর সামাজিক ও আর্থিক অবস্থার কী পরিবর্তন হয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তরও তদন্তের অংশ হওয়া প্রয়োজন।
আরেকটি বিষয়ও জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন আলোচনা চলছে। তবে কোনো ছবি বা দৃশ্য দেখে মৃত্যুকে আত্মহত্যা কিংবা হত্যাকাণ্ড হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঘটনাস্থলের আলামত, ফরেনসিক পরীক্ষা, চিরকুটের সত্যতা, ময়নাতদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসা উচিত।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু তাই শুধু একজন সাংবাদিকের মৃত্যু হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এটি আমাদের সামনে আরেকটি বড় প্রশ্নও রেখে যায়:
গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন কাজ করা একজন সাংবাদিক চাকরি হারালে তাঁর সামাজিক ও পেশাগত নিরাপত্তা কোথায়?
সাংবাদিকরা প্রতিদিন অন্যের অধিকার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন। কিন্তু একজন সাংবাদিক যখন নিজেই চাকরি হারান, আর্থিক সংকটে পড়েন কিংবা পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে চলে যান, তখন তাঁর পাশে দাঁড়ানোর জন্য কার্যকর কোনো নিরাপত্তা কাঠামো কতটা আছে?
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তাই আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন দায়িত্বশীল তদন্ত।
তিনি কেন মারা গেলেন?
চিরকুটে লেখা বিষয়গুলোর সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর সম্পর্ক কী?
সমকালের কাছে তাঁর কোনো পাওনা থাকলে তার প্রকৃতি কী ছিল?
চাকরি হারানোর পর তাঁর জীবনযাত্রা ও আর্থিক অবস্থার কী পরিবর্তন হয়েছিল?
এবং সর্বোপরি,
এই মৃত্যুর পেছনে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দায় থাকলে সেটি কি তদন্তে উঠে আসবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু আত্মহত্যা হয়ে থাকলেও, সেই আত্মহত্যার পেছনের কারণগুলো অনুসন্ধান করা জরুরি। কারণ একজন মানুষের জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পর শুধু ‘আত্মহত্যা’ শব্দটি উচ্চারণ করে তদন্ত শেষ করে দেওয়া যায় না।
প্রয়োজন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু যেন শুধু একটি সংবাদ হয়ে হারিয়ে না যায়। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত নিরাপত্তা, আর্থিক সুরক্ষা এবং মানসিক সুস্থতার বিষয়গুলো নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

আরো পড়ুন
বান্দরবানে ডিবি ও পুলিশের অভিযানে ৩০ হাজার ইয়াবাসহ বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ, গ্রেপ্তার ১
নেপালে ভয়াবহ বন্যায় প্রাণহানি: প্রধানমন্ত্রীর শোক, সহযোগিতার আশ্বাস
মহেশখালী চ্যানেলে নৌকাডুবি: নিখোঁজ নিউজিল্যান্ডের কিশোর আলবার্টের মরদেহ উদ্ধার