রামুতে দ্বিমুখী বাস্তবতা: মাদকবিরোধী সাফল্য, নাকি আস্থার গভীর সংকট?
সম্পাদকীয়:
কক্সবাজারের রামু আজ এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে মাদকবিরোধী অভিযানের ধারাবাহিক সাফল্যের দাবি, অন্যদিকে একই অভিযানের স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন। এই দুই বিপরীত বয়ান এখন শুধু একটি থানা বা একজন কর্মকর্তার বিষয় নয়—এটি পুরো আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন রামু থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভুঁইয়া। তার বিরুদ্ধে একদিকে ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ, অন্যদিকে আবার তাকে সরাতে ‘কোটি টাকার মিশন’ নিয়ে সক্রিয় ইয়াবা সিন্ডিকেটের অভিযোগ—এই দ্বিমুখী বাস্তবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রশ্ন হলো—কোনটি সত্য?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই দুই বিপরীত বয়ানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে জনগণ বিশ্বাস করবে কাকে?
অতীতের ছায়া, বর্তমানের সন্দেহ
রামুতে এর আগে বড় বড় ইয়াবা চালান উদ্ধারের ঘটনায় ‘কম দেখানোর’ অভিযোগ উঠেছিল। সর্বশেষ ঘটনাতেও প্রায় দুই লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধারের দাবি থাকলেও জব্দ তালিকায় দেখানো হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৪ হাজার। এই ধরনের অভিযোগ যদি বারবার ওঠে, তাহলে তা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না—এটি একটি ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দেয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। কারণ, মাদকবিরোধী যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনআস্থা। আর সেই আস্থাই যদি নড়বড়ে হয়ে যায়, তাহলে যত অভিযানই চালানো হোক, তার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
সিন্ডিকেটের পাল্টা আঘাত—বাস্তবতা নাকি কৌশল?
অন্যদিকে, ওসিকে সরাতে ইয়াবা গডফাদারদের সক্রিয় হওয়ার অভিযোগটিও উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে মাদকচক্র দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন কঠোর অবস্থান নেয়, তখন পাল্টা প্রতিক্রিয়া আসবে—এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু এখানেই মূল জটিলতা।
যদি সত্যিই কোনো সিন্ডিকেট অপপ্রচার চালিয়ে থাকে, তবে সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
আর যদি অভিযোগগুলো সত্য হয়, তবে সেটি আরও ভয়াবহ।
দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাষ্ট্র, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
তদন্ত: প্রহসন নয়, হতে হবে দৃশ্যমান সত্য
এই পরিস্থিতিতে কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র দেবদূত মজুমদার যে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই তদন্ত হতে হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং সর্বোপরি বিশ্বাসযোগ্য।
শুধু অভ্যন্তরীণ তদন্ত যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজনে স্বাধীন বা উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করতে হবে, যেখানে প্রশাসনের বাইরের প্রতিনিধিও থাকতে পারে। তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে—আংশিক নয়, পূর্ণাঙ্গভাবে।
রাষ্ট্রের জন্য সতর্কবার্তা
রামুর এই পরিস্থিতি একটি বড় সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
মাদকবিরোধী অভিযান এখন আর শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়—এটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে লড়াই। এখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা—এই তিনটির কোনো বিকল্প নেই।
যদি একজন সৎ কর্মকর্তা অপপ্রচারের শিকার হন, তবে তাকে রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আর যদি কোনো কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তবে তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া আরও বড় দায়িত্ব।
রামুর মানুষ এখন সত্য জানতে চায়।
তারা কোনো গল্প নয়, প্রমাণ চায়।
কারণ, এই লড়াই শুধু ইয়াবার বিরুদ্ধে নয়—
এই লড়াই সত্য ও মিথ্যার, আস্থা ও অবিশ্বাসের।
রাষ্ট্র কি সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে—নাকি সন্দেহই হয়ে উঠবে নতুন বাস্তবতা?
আলোকিত উখিয়া

আরো পড়ুন
বালুর নামে লুট—রাষ্ট্রের কোষাগার কার জন্য?
মসজিদের পবিত্রতা বনাম উৎসবের পরিসর—সংযমই সমাধান
কুতুপালং বাজার ইজারা, না রাস্তা দখলের বৈধতা?