সম্পাদকীয়
কক্সবাজার পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। দেশের পর্যটন শিল্পের অন্যতম প্রধান ভরকেন্দ্র। কিন্তু সেই পর্যটন নগরীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা একজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, মাদক কারবারে জড়িত থাকা এবং কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারির মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে—তখন তা শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের সাথে সাথে এটি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও আইনের শাসনের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
সম্প্রতি জাতীয় দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি আপেল মাহমুদের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগগুলো এতটাই বিস্তৃত এবং ভয়াবহ যে, সেগুলোকে কেবল গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। বরং এসব অভিযোগ নিরপেক্ষ ও উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি রাখে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই সমুদ্রসৈকতে একটি কোম্পানির বিজ্ঞাপন বসানোর সুযোগ দিয়ে মোটা অংকের অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে।

সৈকতের ওয়াচ টাওয়ার, পুলিশ বক্স এবং সরকারি স্থাপনা অবৈধভাবে ভাড়া দিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। যদি এসব তথ্য সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়—এটি সরাসরি ক্ষমতার অপব্যবহার।
আরও উদ্বেগজনক হলো নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ। কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠা পুরো পুলিশ বাহিনীর মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছে জনগণ ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করে। কিন্তু সেই বাহিনীর একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি এমন অভিযোগ ওঠে, তাহলে মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একই সঙ্গে মাদক উদ্ধার করে তা আত্মসাৎ করা, মামলায় কম দেখানো এবং অর্থের বিনিময়ে রফাদফার অভিযোগও অত্যন্ত গুরুতর। মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি অভিযোগ সত্য হয় যে উদ্ধারকৃত মাদক লোপাট করে দেওয়া হচ্ছে, তাহলে তা আইন প্রয়োগ ব্যবস্থার প্রতি জনবিশ্বাসকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো কথিত “সাংবাদিক বাহিনী” গড়ে তুলে এসব অভিযোগকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা। সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। কিন্তু কিছু দাগি অপরাধী বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যদি সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে অপরাধ আড়াল করতে চায়, তাহলে সেটি পুরো সমাজের জন্য বিপজ্জনক।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই অভিযোগগুলো যদি মিথ্যা হয়, তবে তা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা জরুরি। আর যদি সত্য হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া রাষ্ট্রের আর কোনো পথ নেই। কারণ আইন সবার জন্য সমান। পদমর্যাদা, ক্ষমতা বা প্রভাব কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে পারে না।
কক্সবাজার শুধু একটি শহর নয়; এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচয়ের একটি বড় অংশ। সেই শহরের প্রশাসন যদি বিতর্ক আর অনিয়মে জর্জরিত হয়, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব দেশের ভাবমূর্তিতেও পড়বে।
এখন সময় এসেছে সত্য উদঘাটনের। সরকার ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য জনগণের সামনে তুলে ধরা। একই সঙ্গে প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা।
কারণ একটি কথা মনে রাখা দরকার—
রাষ্ট্র টিকে থাকে আইনের ওপর, আর আইনের মর্যাদা টিকে থাকে ন্যায়বিচারের ওপর।

আরো পড়ুন
কক্সবাজার—অদৃশ্য দখলের মুখে এক জনপদ
বালুর নামে লুট—রাষ্ট্রের কোষাগার কার জন্য?
মসজিদের পবিত্রতা বনাম উৎসবের পরিসর—সংযমই সমাধান