Daily Alokito Ukhiya

Online Edition of The Daily Alokito Ukhiya

বিচার চাইতে গিয়ে জেলে—পেকুয়ায় মা-মেয়ের ঘটনার নির্মম বাস্তবতা

সম্পাদকীয়
বাংলাদেশের সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে আইনের সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা কখনো কখনো এমন নির্মম হয়ে ওঠে যে বিচার চাইতে গিয়ে মানুষ নিজেই অপরাধীর আসনে বসে যায়। কক্সবাজারের পেকুয়ায় ঘটে যাওয়া এক মা-মেয়ের ঘটনা যেন সেই কঠিন বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ।
আলোকিত উখিয়া
জুবাইদা জন্নাত। জন্মের কয়েক মাস পরই তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। অভিযোগ ছিল যৌতুকের জন্য তার মায়ের ওপর নির্যাতনের। সেই সময় তার মা রেহেনা জন্নাত রানু মামলা করেছিলেন। পরে আপোষ হলেও মেয়েকে নিয়ে তাকে সংগ্রামের জীবন বেছে নিতে হয়।
অসংখ্য কষ্ট সহ্য করে তিনি মেয়েকে বড় করেছেন, পড়াশোনা করিয়েছেন। আজ জুবাইদা একটি কলেজে অনার্সে অধ্যয়ন করছে।
এদিকে কয়েক বছর আগে তার বাবা মারা যান। পিতার কিছু জমিজমা রয়েছে, যেখানে আইন অনুযায়ী জুবাইদা একজন ওয়ারিশ। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে—চাচা, জ্যাঠা ও চাচাতো ভাইরা তার সেই আইনগত অংশ দিতে রাজি নন।
অবশেষে জুবাইদা আদালতের দ্বারস্থ হন। আইনজীবীর পরামর্শে মামলা দায়ের করা হয়। আদালত তদন্তের দায়িত্ব দেয় প্রশাসনের কাছে।
কিন্তু এখান থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ ভোগান্তি। মাসের পর মাস কেটে যায়, তদন্তের অগ্রগতি নেই। ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও ওয়ারিশ সনদ পাওয়া যায় না। অভিযোগ ওঠে—তদন্তের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা কোনো সহযোগিতা করছেন না।
পরিস্থিতি যখন স্থবির হয়ে পড়ে, তখন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের আবেদন করা হয় আদালতে। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করে নতুন করে তদন্তের দায়িত্ব দেয় পেকুয়া থানাকে।
এই পর্যায়ে অভিযোগ আরও গুরুতর। বলা হচ্ছে, তদন্ত কর্মকর্তা রিপোর্ট বাদীর পক্ষে দিতে হলে ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। বাধ্য হয়ে মা-মেয়ে কষ্ট করে সেই টাকা জোগাড় করে দেন।কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পর যে তদন্ত রিপোর্ট আসে, তা যায় সম্পূর্ণ আসামি পক্ষের অনুকূলে। সেখানে বলা হয়—ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি, সাক্ষীও নেই। অভিযোগ অনুযায়ী, টাকা নেওয়ার পরও বিপরীত রিপোর্ট দেওয়ায় জুবাইদা থানার ওসি ও সার্কেল এএসপি বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন এবং নিজের টাকা ফেরত চান। এরপর ঘটে আরও বিস্ময়কর ঘটনা।
গত ৫ মার্চ যখন জুবাইদা ও তার মা থানায় গিয়ে টাকা ফেরত চাইতে যান, তখন অভিযোগ উঠেছে—তাদের সেখানেই হয়রানির শিকার হতে হয়। পরে উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ তুলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এই ঘটনাটি যদি সত্য হয়, তবে তা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়—বরং আমাদের বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার জন্যও বড় প্রশ্ন।
একজন মেয়ে তার পিতার পরিচয় ও ওয়ারিশি অধিকার চাইবে—এটা কি অপরাধ?
ঘুষের টাকা ফেরত চাইলে কি তার জায়গা জেলখানায়?
আইনের শাসন মানে হলো দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো। বিচার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে মানুষের আস্থা। সেই আস্থা যদি ভেঙে যায়, তাহলে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। যদি অভিযোগ মিথ্যা হয়, সেটাও প্রকাশ্যে আসুক। আর যদি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কারণ বিচার চাইতে গিয়ে যদি মানুষ শাস্তি পায়, তাহলে সমাজে অন্যায়ই একসময় নিয়মে পরিণত হয়। আজ প্রয়োজন সত্য উদঘাটন। প্রয়োজন অসহায় মা-মেয়ের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
আলোকিত উখিয়া