উখিয়ায় রিসোর্টে আগুনে ১০ প্রাণহানি: ডিএনএ পরীক্ষার অপেক্ষা, জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক, উখিয়া

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু ঘিরে তদন্ত চলছে। ঘটনার তিন দিন পরও মরদেহগুলোর পরিচয় চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করার জন্য ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়া, মামলার অগ্রগতি এবং রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়নি।

গত ১৭ অক্টোবর শনিবার সকাল ৭টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের পাশে অবস্থিত রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পর্যটকদের অনেকে ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। পরে ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আরও ছয়জন আহত হয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা

১৮ অক্টোবর কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে নিহত ১০ জনের নাম প্রকাশ করা হয়। তবে পরবর্তী প্রতিবেদনে জানানো হয়, আগুনে মরদেহগুলো পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় পরিচয় চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হচ্ছে। মরদেহের নমুনা ঢাকায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) পাঠানোর খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

ফলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নামের তালিকা এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত শনাক্তকরণকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। পরীক্ষার ফল ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়ার পরই পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি চূড়ান্তভাবে বলা যাবে।

সহকারী ব্যবস্থাপকের রিমান্ড আবেদন

এ ঘটনায় রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন ওরফে সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে ২০ অক্টোবর দুপুর পর্যন্ত রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে রিসোর্টের মালিক ও কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। মামলায় কারা আসামি, মালিকদের কারও নাম বাদ পড়েছে কি না এবং পরবর্তী সময়ে নতুন কাউকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কি না, তা মামলার সর্বশেষ নথি ও পুলিশের বক্তব্য দিয়ে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন

ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য অনুযায়ী, রিসোর্টটিকে আগে অগ্নিনিরাপত্তার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল। রিসোর্টটির ফায়ার লাইসেন্স ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও সংবাদমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে। প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এটিকে আগুনের চূড়ান্ত কারণ বলা যাবে না।

এখন প্রশ্ন হলো, সতর্কবার্তা দেওয়ার পর ঝুঁকি দূর করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? পর্যটকদের জন্য কার্যকর জরুরি বহির্গমনপথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল কি? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত পরিদর্শন করেছিল কি না, সেটিও তদন্তে খতিয়ে দেখা জরুরি।

দশটি প্রাণহানির দায় নির্ধারণ হবে কীভাবে?

একটি পর্যটনকেন্দ্রে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই তদন্তে শুধু আগুন কীভাবে লেগেছে, তা নির্ধারণ করলেই চলবে না। নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, সতর্কবার্তার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না এবং কারও অবহেলা প্রাণহানিতে ভূমিকা রেখেছে কি না, সেসব প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হবে।

দশটি প্রাণের বিনিময়ে যদি নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা সামনে আসে, তাহলে দায় নির্ধারণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে তদন্তের আগে কাউকে দোষী ঘোষণা না করে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

এখন জনস্বার্থে প্রয়োজন ডিএনএ পরীক্ষার ফল, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, মামলার অগ্রগতি এবং অগ্নিনিরাপত্তা তদারকির পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ। শোক প্রকাশের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই হবে এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

দৈনিক আলোকিত উখিয়া