কিশোরগঞ্জের শেখ রহমান যুক্তরাষ্ট্রে পঞ্চমবারের মতো সিনেটর নির্বাচিত
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের প্রথম মুসলিম ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত স্টেট সিনেটর শেখ রহমান। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিক ২০২৬ সালের নির্বাচনে পঞ্চমবারের মতো সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর এ সাফল্যে আনন্দিত জন্মভূমি কিশোরগঞ্জের মানুষ ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত জনপদ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে উঠে আসা এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তির নাম শেখ রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের প্রথম মুসলিম স্টেট সিনেটর হিসেবে ইতিহাস গড়া এই রাজনীতিক আবারও নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন।
২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ৫ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে তিনি পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনে তাঁর বিপক্ষে কোনো প্রার্থী না থাকায় তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। তাঁর নামে ৩৫ হাজার ১০১ ভোট দেখানো হয়েছে। এর আগে ১৯ মে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী রবিন ম্যাককয়কে পরাজিত করে দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করেন তিনি।
কিশোরগঞ্জ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে
শেখ রহমানের জন্ম ১৯৬০ সালের ১৫ নভেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার সরারচর গ্রামে। তাঁর বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা নজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের সময় মাত্র ১৩ বছর বয়সে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছিলেন তিনি। যুদ্ধের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৮১ সালের ৭ জানুয়ারি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান শেখ রহমান। সেখানে পড়াশোনার খরচ চালাতে ঘণ্টায় মাত্র ৩ দশমিক ৩৫ ডলার মজুরিতে রেস্তোরাঁয় ডিশওয়াশারের কাজ শুরু করেন।
পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে পিৎজা হাট, ডমিনো’স ও ক্রোগার প্রতিষ্ঠানে করপোরেট পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ব্যবসা ও রিয়েল এস্টেট খাতেও যুক্ত হন। ১৯৯৫ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া থেকে অর্থনীতি ও গ্লোবাল স্টাডিজ বিষয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।
ইতিহাস গড়েন ২০১৮ সালে
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার পর ২০১৮ সালে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে জয়ী হন শেখ রহমান। ২০১৯ সালের ১৪ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সিনেটর হিসেবে শপথ নেন।
এর মধ্য দিয়ে তিনি জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের প্রথম মুসলিম আইনপ্রণেতা এবং প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত স্টেট সিনেটর হিসেবে ইতিহাস গড়েন। তিনি জর্জিয়ার ৫ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে এখনো রয়েছে গভীর সম্পর্ক
যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করলেও নিজের জন্মভূমির সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছেন শেখ রহমান। ২০২৪ সালে তিনি জন্মস্থান সরারচরে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করতে এসেছিলেন। সে সময় নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করেন এবং বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে সময় কাটান।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য দিয়েছেন তিনি।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য অনুপ্রেরণা
একসময় যুক্তরাষ্ট্রে নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে রেস্তোরাঁয় থালাবাসন পরিষ্কারের কাজ করা একজন মানুষ আজ একটি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচিত আইনপ্রণেতা। তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা অভিবাসী বাংলাদেশিদের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ।
কিশোরগঞ্জের সরারচর থেকে জর্জিয়ার স্টেট সিনেট, শেখ রহমানের এই যাত্রা প্রমাণ করে, অধ্যবসায়, যোগ্যতা ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা একজন মানুষকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত করে তুলতে পারে।
একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: শেখ রহমান যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের সিনেটর নন। তিনি জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের স্টেট সিনেটর। তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম স্টেট সিনেটর নন; তিনি জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের প্রথম মুসলিম স্টেট সিনেটর।
আরো পড়ুন
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: আগে জানেনি ঢাকা, ছেলের মরদেহ ফেরত চান বাবা
কক্সবাজারে RAISE প্রকল্পের মাধ্যমে ১৩ জন প্রবাসী ফেরত সেবাগ্রহীতার নতুন কর্মসংস্থান
ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার ২৯ বাংলাদেশি, ২৪ জনই সিলেটের