কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল পরীক্ষামূলক চালু

আলো‌কিত রি‌পোর্টঃ

ঝিনুক আকৃতির ছাদ, স্টিলের কাঠামোয় সমুদ্রের ঢেউয়ের নকশা। সাগরঘেঁষা কক্সবাজারের প্রকৃতি ও পর্যটননগরীর বৈশিষ্ট্যকে সামনে রেখেই নান্দনিকভাবে নির্মাণ করা হয়েছে বিমানবন্দরের নতুন আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের নবনির্মিত আন্তর্জাতিক মানের এই টার্মিনালে ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে যাত্রীসেবা শুরু হয়েছে। আপাতত অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীরা নতুন টার্মিনাল ব্যবহার করছেন। তবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্যও টার্মিনালটি প্রস্তুত বলে জানিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, বেবিচক।

বেবিচকের সদস্য এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম জানিয়েছেন, পুরোনো টার্মিনালে একটি ফ্লাইটে ৪০০ থেকে ৫০০, কখনো ৫৫০ জন পর্যন্ত যাত্রী হলে ধারণক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হতো। নতুন টার্মিনালের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিচালনাগত কোনো সমস্যা থাকলে তা চিহ্নিত করে সমাধান করা হবে।

আধুনিক সুবিধায় নতুন টার্মিনাল

প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৫ বর্গমিটার আয়তনের নতুন আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনালে রয়েছে ১৪টি চেক-ইন কাউন্টার, ১০টি ইমিগ্রেশন ডেস্ক এবং দুটি আধুনিক ব্যাগেজ ক্লেইম বেল্ট।

এ ছাড়া যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য রয়েছে সাতটি স্ক্যানার, মেটাল ডিটেকশন ব্যবস্থা এবং হোল্ড ব্যাগেজ স্ক্যানিংয়ের আলাদা সুবিধা। যাত্রী চলাচলের জন্য রয়েছে চারটি এসকেলেটর, ছয়টি লিফট, বোর্ডিং ব্রিজ ও আধুনিক লাগেজ হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা।

আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের জন্য বহির্গমন যাত্রীদের চারটি এবং আগমনকারী যাত্রীদের ছয়টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার রাখা হয়েছে। রয়েছে দুটি লাগেজ ডেলিভারি বেল্ট, সিসিটিভি, ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেম, পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম এবং ভারী হ্যান্ডব্যাগ স্ক্যানিংয়ের সুবিধা। রয়েছে ডিউটি-ফ্রি শপ ও বোর্ডিং ব্রিজও।

বছরে ২০ লাখ যাত্রী পরিচালনার লক্ষ্য

বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, নতুন অবকাঠামো পুরোপুরি চালু হলে কক্সবাজার বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা বর্তমান প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ২০ লাখে উন্নীত হবে।

নতুন টার্মিনাল নির্মাণে অনুমোদিত ব্যয় প্রায় ৩৬২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এর সঙ্গে বিমানবন্দরের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বড় আকারের অ্যাপ্রনসহ অন্যান্য অবকাঠামোও নির্মাণ করা হয়েছে।

একসঙ্গে থাকবে বড় উড়োজাহাজ

বিমানবন্দরে নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটারের অ্যাপ্রন। এতে একই সময়ে দুটি ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ এবং তিনটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ রাখার সক্ষমতা রয়েছে।

বিমানবন্দরের রানওয়েও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ৯ হাজার ফুট থেকে বাড়িয়ে এর দৈর্ঘ্য করা হয়েছে ১০ হাজার ৭০০ ফুট। বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, এই সম্প্রসারণের ফলে বড় আকারের ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। রানওয়ে সম্প্রসারণে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৪৩ হেক্টর জমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।

রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় প্রায় ৩ হাজার ৭০৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা এবং চুক্তিমূল্য প্রায় ১ হাজার ৭৯৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইটিং ও ক্যাট-টু এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং সিস্টেমও স্থাপন করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হওয়ার পথে কক্সবাজার

কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরের অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্যটির সঙ্গে সরাসরি আন্তর্জাতিক আকাশ যোগাযোগ তৈরি করা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এতদিন বিমানবন্দরের রানওয়ে ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বড় উড়োজাহাজ পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা ছিল। ফলে বিদেশি পর্যটকদের অনেক ক্ষেত্রে প্রথমে ঢাকায় এসে পরে কক্সবাজার যেতে হতো। নতুন টার্মিনাল ও রানওয়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি পরিবর্তনের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

বেবিচক সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা যাচাইয়ের পর বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা, ICAO-এর সনদও পেয়েছে। আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে আগামী অক্টোবর থেকে।

তবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাস্তবে শুরু হওয়ার বিষয়টি শুধু টার্মিনাল প্রস্তুত হওয়ার ওপর নির্ভর করবে না। এয়ারলাইনস, আন্তর্জাতিক রুট, ফ্লাইট অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রমও এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

সমুদ্রের শহরে সমুদ্রের নকশার টার্মিনাল

কক্সবাজারের নতুন টার্মিনালের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি এর স্থাপত্য।

ঝিনুকের আকৃতির ছাদ এবং তার ওপর স্টিলের কাঠামোয় সমুদ্রের ঢেউয়ের নকশা পুরো টার্মিনালকে কক্সবাজারের সমুদ্রভিত্তিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে এটি শুধু বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা অবকাঠামো নয়, কক্সবাজারের পর্যটন প্রবেশদ্বার হিসেবেও একটি নতুন দৃশ্যমান পরিচয় তৈরি করছে।

নতুন টার্মিনালে এখন চলছে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম। সামনে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শুরু হলে কক্সবাজার বিমানবন্দর দেশের পর্যটন খাতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আকাশ যোগাযোগে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।