Daily Alokito Ukhiya

Online Edition of The Daily Alokito Ukhiya

সীমান্তের ২০ পয়েন্ট দিয়ে রাখাইনে দেদারছে পণ্য পাচার

ডিজিটাল আলোকিত ডেস্ক:

মায়ানমারের রাখাইন (আরাকান) রাজ্যে বাংলাদেশ থেকে উদ্বেগজনকভাবে পাচার হয়ে যাচ্ছে নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে অন্যান্য পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে খাদ্যসামগ্রী, ইউরিয়া সার, জ্বালানি তেল ও ওষুধ। আরো পাচার হচ্ছে বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ এসিড ও বারুদ। পণ্য পাচারে পাচারকারীরা নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সীমান্তের অন্তত ২০টি পয়েন্ট ছাড়াও নৌপথ ব্যবহার করছে।

পণ্য পাচারে বেশ আলোচিত উখিয়া পালংখালীর চারটি চোরাই পয়েন্ট।

চলমান বৈশ্বিক সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সীমান্তের চোরাপথে অব্যাহত পণ্য পাচারে একদিকে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে সরকার দেশের পণ্যসামগ্রী, বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করা জ্বালানি, ভোজ্যতেলসহ ইউরিয়া সার পাচারে যত কড়াকড়ি আরোপ করছে, পাচারকারী চক্র তত বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

রাখাইনে মজুদ হচ্ছে বাংলাদেশের পণ্য

 রাখাইনের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মায়ানমারের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে রাখাইন রাজ্যের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সংঘাতের পর থেকে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজ্যটি এক প্রকার বিচ্ছিন্ন।

দেশটির অন্যান্য এলাকা থেকে পণ্যসামগ্রীও রাখাইনে পাঠানো বন্ধ রয়েছে। এসব কারণে আরাকান আর্মি শাসিত রাখাইনে বিভিন্ন পণ্যের তীব্র সংকট চলছে। লোকজনের বেশির ভাগ চাহিদা মেটানো হচ্ছে বাংলাদেশের পণ্য দিয়ে।

সীমান্তের নানা সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কথা ভেবে আরাকানের ব্যবসায়ীরাও সেখানে পণ্য মজুদ করছেন।

আরাকান আর্মি এপারের পাচারকারীদের পণ্য পাচারে নানাভাবে প্রলুব্ধ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে দফায় দফায় বিপুল পরিমাণে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা এর প্রমাণ। আরাকান আর্মি এপারের নিত্যপণ্যের বিনিময়ে ওপার থেকে ইয়াবা পাচার আরো সহজ করে দিয়েছে।

পণ্য পাচারে আলোচিত পালংখালী : গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত দিয়ে ব্যাপক হারে নিত্যপণ্যসহ সার, জ্বালানি ও বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ পাচার হওয়ার তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এতে পাচারকারীদের তথ্যও দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, তথ্যে উল্লেখ রয়েছে, পাচারকারীরা বেশির ভাগই একাধিক চক্রের অধীনে কাজ করে থাকে। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের সীমান্ত এলাকাটি নাফ নদীর তীরে। এখানে নাফ নদী চওড়ায় কম। মিনিট বিশেকের মধ্যে নৌকা পারাপার করা যায়। এ জন্য চোরাই পণ্য পাচারকারীদের বহুল ব্যবহৃত স্থান হয়ে উঠেছে পালংখালী।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, কেবল পালংখালীর চারটি চোরাই পয়েন্টে ৪০ জন পাচারকারীর নাম উল্লেখ রয়েছে। পাচারকারীদের অধীনে ৫০ থেকে ২০০ জন শ্রমিক রয়েছে। পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত দুজন ইউপি সদস্যের নামও পাচারকারীদের তালিকায় রয়েছে।

ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত এলাকা বিডি পিলার নম্বর ২৭ ও ৩৫ দিয়ে বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিয়ত ইউরিয়া সার পাচারের তথ্য উল্লেখ রয়েছে। সারের বদলে আরাকান থেকে ইয়াবা ও গরু-মহিষ এপারে পাচার করা হয়।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পালংখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আঞ্জুমানপাড়ার গ্রামের বাসিন্দা ছৈয়দুল বশর ওরফে চিচি নামের একজনকে সীমান্ত এলাকার সবচেয়ে বড় মাপের সিন্ডিকেটপ্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আঞ্জুমানপাড়া, বিডিআর ক্যাম্প এলাকার মুফিজুর রহমান, কাজী শহিদুল্লাহ, বাবুল মেম্বার, ধামনখালীর মনিরুল ইসলাম মনির, বলি রশিদ, জসিম উদ্দিন, সাত্তার মিয়া ও আবুল হাসেম, বাজার কমিটির সভাপতি আলমগীর, ফরিদুল আলম ওরফে চিকন ফরিদসহ অনেক সিন্ডিকেটপ্রধানের নাম রয়েছে।

তালিকায় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের খাইরুল ইসলাম মেম্বার, ইলিয়াস মাঝি জহির ও খাইরুল আলমের নাম রয়েছে। পালংখালী ইউনিয়নের রহমতরবিল, আঞ্জুমানপাড়া, ধামনখালী ও নলবনিয়া পয়েন্টই পণ্য পাচারের প্রধান রুট।

স্থানীয় লোকজন জানায়, এসব পণ্যের বিনিময়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে মাদকদ্রব্য ইয়াবা। কিছু ক্ষেত্রে নগদ টাকা ও স্বর্ণের বিনিময়েও লেনদেন হচ্ছে। ফলে সীমান্ত এলাকায় এক ধরনের অবৈধ অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা ক্রমে কঠিন হয়ে পড়ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চোরাচালান কার্যক্রমটি একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম স্তরে রয়েছে কয়েকজন রোহিঙ্গা সশস্ত্র সদস্য, যারা রাখাইন রাজ্য থেকে চাহিদা বা অর্ডার সংগ্রহ করে। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল, যার মধ্যে পালংখালী ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্যের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। তৃতীয় স্তরে রয়েছে ছয়-সাতজনের একটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, যারা পণ্য সংগ্রহ, মজুদ ও সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।

স্থানীয় সূত্র ও একাধিক নির্ভরযোগ্য তথ্য মতে, এসব চোরাচালান কার্যক্রমের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) কিছু কমান্ডারের নাম উঠে এসেছে। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো কোনো নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পালংখালী ইউনিয়নের এক চৌকিদার (গ্রাম পুলিশ) বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদিন ছয় থেকে আটটি ট্রাকে করে বিভিন্ন পণ্য আসে এই এলাকায়। অথচ এত পণ্য ভোগ করার মতো মানুষ এখানে নেই। ফলে অতিরিক্ত এসব পণ্য চোরাপথে মায়ানমারে পাচার হয়ে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘রাত হলেই সীমান্ত এলাকায় অচেনা মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়। অনেক সময় ভয়ে কেউ কিছু বলতে চায় না।’

এ বিষয়ে পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান গফুরউদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা তো রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দাদের খাওয়ানোর দায়িত্ব নিইনি। তবু তাদের প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যই এখন চোরাপথে আমাদের দেশ থেকে যাচ্ছে। মায়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় এসব পণ্যের ওপর তারা পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।’

তিনি জানান, বাংলাদেশে যে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ১২১ টাকা, তা সীমান্ত পেরিয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে অন্যান্য পণ্যও কয়েক গুণ বেশি দামে পাচার হচ্ছে।

অন্যান্য পয়েন্টেও পণ্য পাচার : বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ও তুমব্রু নয়াপাড়া, মণ্ডলপাড়া, জলপাইতলীসহ সীমান্ত এলাকার ঘরে ঘরে পাচারকারী রয়েছে। টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কাটাখালী, উলুবনিয়া, খারাইঙ্গাঘোনা, ওয়াবরাং, রঙ্গিখালী, জাদিমুরা, বটতলি, নাইটংপাড়াসহ নাফ নদী দিয়ে পণ্য পাচার করা হয়ে থাকে।

নৌপথে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, হাতিয়া, সন্দ্বীপসহ উপকূলীয় বিভিন্ন দ্বীপাঞ্চলীয় এলাকা থেকে পণ্য নিয়ে নৌকা বোঝাই করে পাচারকারীরা মায়ানমারে পাচার করে আসছে।

পাচারকালে সার ও জ্বালানি তেল উদ্ধার : মায়ানমারে পাচারকালে গত এক বছরে শুধু কোস্ট গার্ড উদ্ধার করেছে এক লাখ ৬০ হাজার ২৫০ কেজি সার এবং ১৪ হাজার ৮৮১ লিটার ডিজেল ও ৩১ হাজার ২৭০ লিটার অকটেন। সেই সঙ্গে ৮৪ জন পাচারকারীকেও আটক করা হয়েছে।

কোস্ট গার্ড পূর্ব জোন কর্তৃপক্ষ কালের কণ্ঠকে জানিয়েছে, গত এক মাসে কোস্ট গার্ড পূর্ব জোন আট হাজার ৮০ লিটার ডিজেল উদ্ধার করেছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য আট লাখ ৮০ হাজার টাকা। অভিযান চলাকালে ৩২ জন পাচারকারীকে আটক করা হয়।

আরাকান আর্মির কাছে যাচ্ছে দাহ্য পদার্থ : উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মায়ানমারে পাচার হচ্ছে এসিড ও বারুদের মতো দাহ্য পদার্থও। গত ২৭ মার্চ পালংখালী দক্ষিণ স্টেশনের একটি গুদাম থেকে উখিয়া থানার পুলিশ ১০০ জেরিকেন ভর্তি তিন হাজার লিটার এসিড উদ্ধার করেছে।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, আরাকান আর্মি মাইন, বোমা ও ককটেলজাতীয় বিস্ফোরক তৈরির কাজে এসব দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে থাকে। বাংলাদেশ থেকে বারুদ লাগানো কাঠির ম্যাচ এবং গোলমরিচও পাচার হচ্ছে। এসবও বিস্ফোরক তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়।

স্থানীয় সংসদ সদস্যের ভাষ্য : কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাখাইনে পণ্য পাচার কোনোভাবেই সহ্য করা যাবে না। বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সরকার এ বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত সচেতন রয়েছে।’ তিনি বলেন, সীমান্তের পাচারকারীদের কোনো রাজনীতি বা দল নেই। এরা পাচারকারী, দেশ ও জাতির শত্রু। তাদের রুখতে স্থানীয় লোকজনকে এগিয়ে এসে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে সহযোগিতা করার আহবান জানান তিনি।

মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে পণ্য পাচার বিষয়ে বিজিবি রামু সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বিজিবি সীমান্ত এলাকায় চোরাই পণ্য পাচার রোধে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্ত এলাকায় পাচার রোধে অত্যন্ত কড়া নজর রাখা হয়েছে। তিনি এ ক্ষেত্রে সীমান্ত এলাকায় বাসিন্দাদের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

কালের কণ্ঠ