Daily Alokito Ukhiya

Online Edition of The Daily Alokito Ukhiya

দেশের সম্মান এনে দেওয়া হাতে হাতকড়া, সেই হাতেই প্রতিমন্ত্রীর ভার

আলোকিত ডেস্ক রিপোর্ট:

রাজনীতিতে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ এখন স্বাভাবিক চিত্র। ক্রীড়াবিদরাও এর ব্যতিক্রম নন। বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্রীড়াবিদ থেকে সংসদ সদস্য হয়ে মন্ত্রিত্ব পাওয়ার নজির খুবই কম। স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত তিনজনের স্থান হয়েছে এই তালিকায়। শুরুটা হয়েছে মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমকে দিয়ে। মাঝে হয়েছেন আরিফ খান জয়। আর সবশেষ শপথ নিয়েছেন আমিনুল হক। কোনো সাবেক ক্রীড়াবিদ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে কিংবা টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী কখনো হননি। আমিনুল হকই প্রথম।

ভোলার ছেলে আমিনুল। বেড়ে ওঠেন ঢাকার মিরপুরে। খেলোয়াড়ি জীবনের শুরুর যাত্রাটাও সেখান থেকেই। ভাইয়ের হাত ধরেই ফুটবলের প্রেমে পড়া। কিশোর বয়সে খ্যাপ খেলে পাওয়া প্রথম ১৫০ টাকা যখন মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, সেই তৃপ্তির হাসিই যেন আমিনুলকে বুঝিয়ে দিয়েছিল তাঁকে অনেক দূর যেতে হবে।

পাইওনিয়ার লিগের এমএসপিসি সিটি ক্লাবে যখন হাতেখড়ি হলো, তখনই কোচরা টের পেয়েছিলেন, এই ছেলেটি বিশেষ কিছুর জন্য জন্ম নিয়েছে। জীবনের প্রথম পেশাদার লিগেই নিজের জাত চেনান। অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য, নব্বইয়ের দশকে ঢাকার পাইওনিয়ার লিগে নিজের প্রথম ৯ ম্যাচে কোনো গোল হজম করেননি আমিনুল হক। গোলবারের অতন্দ্রপ্রহরীর ভূমিকায় সফলভাবে লিগের সমাপ্তি টানেন।

জাতীয় দলে অভিষেক ১৯৯৮ সালে কাতারের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে। খেলেছেন ২০১১ সাল পর্যন্ত। চোট ছাড়া তাঁকে কখনো বসে থাকতে হয়নি। ২০০৩ সালে ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়াম মেতেছিল সাফ ট্রফি জয়ের আনন্দে। পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল সাফের ফাইনালের দিকে। মালদ্বীপের বিপক্ষে টাইব্রেকারে আমিনুল যখন দ্বিতীয় শটটি রুখে দিলেন, তখন পুরো গ্যালারি গর্জে উঠেছিল। সেই মুহূর্তটি আমিনুলকে পরিণত করেছিল জাতীয় নায়কে। বাংলাদেশের ফুটবলে এখনো ২০০৩ সালের সাফ জয়ই শ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে গণ্য করা হয়।

২০১০ সালের এসএ গেমসে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ দল সোনা জিতেছিল। বিস্ময়করভাবে পুরো টুর্নামেন্টে আমিনুলের বিপক্ষে কোনো গোল হয়নি।

খোলোয়াড়ি জীবনে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০০৩ সালে। তাকে পেতে কাড়াকাড়ি লাগে জায়ান্ট ক্লাব আবাহনী আর মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে। মুন্সিগঞ্জের এক গোপন জায়গায় ১২ দিন আমিনুলকে লুকিয়ে রাখে মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব। হঠাৎ একদিন বন্দুকের মুখে তাঁকে অপহরন করে আবাহনী লিমিটেড। বন্দী করে মোহাম্মদপুরের একটি বাড়িতে রাখা হয়। একপর্যায়ে আমিনুল ওই বাড়ির দোতলার ব্যালকনি থেকে লাফিয়ে পালিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড অফিসে হাজির হন।

গোলরক্ষক আমিনুল হকের গল্পটা কেবল সাফল্য আর প্রাপ্তির। দীর্ঘ ২০ বছর জাতীয় দল এবং ক্লাব ফুটবলে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, গোলবারের সামনে। অতন্দ্র প্রহরীর মতো প্রতিটি আক্রমণ ঠেকিয়ে লাল-সবুজের পতাকাকে সমুন্নত রেখেছিলেন। ২০১৩ সালে আবেগের বুট এবং বিশ্বাসের গ্লাভস তুলে রাখেন। নাম লেখান জাতীয় রাজনীতিতে।

মাশরাফি-সাকিবরা যখন স্রোতে গা ভাসিয়ে ফ্যাসিবাদের সাথে শামিল হন, সঙ্গী হন ক্ষমতার। আমিনুল তখন নাম লেখান বিরোধী শিবিরে। হাটতে শুরু করেন প্রতিকূল পরিবেশে। ২০১৪ সালে গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারস বেগম খালেদা জিয়া। চারিদিকে পুলিশ গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি, ধরপাকড়। তখন মার্চের কোনো একদিন বেগম খালেদা জিয়ার হাতে ফুল দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন বাংলাদেশ ফুটবলের সাবেক এই অধিনায়ক।

বিএনপির রাজনীতিতে নাম লিখিয়ে শিকার হয়েছেন নির্যাতনের। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেমে তৎকালীন সরকারের পেটোয়া বাহিনীর হাতে রক্তাক্ত হয়েছেন জিয়াউদ্যানে। যে হাতে দেশকে এনে দিয়েছিলেন সাফল্য, সে হাতেই উঠে হাতকড়া। একাধিকবার বন্দী হয়েছেন কারাগারে। রাজনীতির কালোছায়া তাকে আচ্ছন্ন করলেও দমিয়ে রাখতে পারেনি, কারণ আমিনুলদের রক্তে সাহসের শিখা জ্বলজ্বল। শত নির্যাতন, কারাবাস এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের নিষ্ঠুরতার মধ্যেও হার মানেননি, মাথা নত করেননি। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজপথে লড়াই চালিয়ে গেছেন।

আমিনুল হক মাঠে যেমন গর্বের সঙ্গে দেশের পতাকা উড়িয়েছিলেন, তেমনি রাজনীতির আঙিনায় গণতন্ত্রের জন্য নিঃস্বার্থ লড়াই করেছেন। ঢাকা-১৬ আসনে নির্বাচনে তিনি হেরেছেন ঠিকই কিন্তু তার ওপর ক্রীড়াঙ্গণের ভার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দায়িত্ব নিয়েই প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের দুই তারকা সাকিব আল হাসান ও মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া এবং মামলা নিয়েও ইতিবাচক বার্তা দেন। বিসিবিতে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার ও মাঠে প্রবেশে বিধিনিষেধ উঠিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। গোল পোস্টে যেমন কোনো বলকে ঢুকতে দেননি, তেমনি দেশের ক্রীড়াঙ্গনেও ‘অনিয়মের গোল’ হতে না দেওয়ার অঙ্গীকার ফেরাতে চাইলেন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা।

আলোকিত উখিয়া

error

Enjoy this blog? Please spread the word :)