সম্পাদকীয়
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়। এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জাতীয় গর্বের প্রতীক। কিন্তু সেই সৈকতের বালিয়াড়ি যদি দখলদারদের হাতে বন্দী হয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই সৈকত কি সত্যিই জনগণের, নাকি কিছু প্রভাবশালী দখলবাজের?
সম্প্রতি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিশাল বালিয়াড়ি মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে দখল করে নিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট। সরকারি জমি, অথচ সেখানে চলছে ব্যক্তিগত মালিকানার মতো দখল ও নিয়ন্ত্রণ। একের পর এক অস্থায়ী স্থাপনা, বেআইনি দখল এবং পরিকল্পিতভাবে বালিয়াড়ি কেটে জায়গা দখলের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা কক্সবাজারের পরিবেশ ও পর্যটনের জন্য ভয়াবহ সংকেত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরবতা। জেলা প্রশাসন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, পর্যটন কর্পোরেশন কিংবা পর্যটন মন্ত্রণালয়—যাদের এগিয়ে এসে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, তাদের দৃশ্যমান কার্যক্রম এখনো চোখে পড়ছে না। এই নীরবতা সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে এবং দখলদারদের সাহস আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বালিয়াড়ি কোনো সাধারণ জমি নয়। এটি উপকূলীয় পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং উপকূলীয় ক্ষয় থেকে এই বালিয়াড়ি সৈকতকে রক্ষা করে। যদি এই প্রাকৃতিক বাঁধ ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে শুধু পরিবেশ নয়, পুরো পর্যটন অর্থনীতিও ঝুঁকির মুখে পড়বে। কক্সবাজারের সৌন্দর্য ধ্বংস হলে তার ক্ষতি পূরণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এই পরিস্থিতিতে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর উদ্বেগ স্বাভাবিক। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা কমিটি সহ চারটি সংগঠন যৌথভাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা সময়োপযোগী উদ্যোগ। কারণ স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা যখন প্রশ্নের মুখে, তখন কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিষয়টি পৌঁছানো জরুরি হয়ে পড়ে।
তবে শুধু স্মারকলিপি দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রয়োজন শক্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ, দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এবং সৈকতের বালিয়াড়িকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের পরিকল্পনা। কক্সবাজারকে বাঁচাতে হলে এখনই কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। এটি দেশের সম্পদ, মানুষের সম্পদ, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ। সেই সম্পদ রক্ষা করা রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং সচেতন নাগরিক—সবাইয়ের দায়িত্ব।
আজ যদি বালিয়াড়ি দখল থামানো না যায়, কাল হয়তো পুরো সৈকতই হারিয়ে যাবে। তখন আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।
সময় এখনই—কক্সবাজারকে দখলমুক্ত করার।
আলোকিত উখিয়া

আরো পড়ুন
বালুর নামে লুট—রাষ্ট্রের কোষাগার কার জন্য?
মসজিদের পবিত্রতা বনাম উৎসবের পরিসর—সংযমই সমাধান
রামুতে দ্বিমুখী বাস্তবতা: মাদকবিরোধী সাফল্য, নাকি আস্থার গভীর সংকট?