পুলিশের হিসাবে ৫০ হাজার, প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি দেড় লাখ ইয়াবা; এসআই কিবরিয়াসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তদন্তের কথা জানিয়েছে ঊর্ধ্বতন পুলিশ
নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক আলোকিত উখিয়া
কক্সবাজারের উখিয়ায় ইয়াবা উদ্ধারের পরিমাণ নিয়ে গুরুতর গরমিলের অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের কথা বলা হলেও স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, উদ্ধার করা হয়েছিল দেড় লাখ পিস ইয়াবা। একই সঙ্গে একটি নাইন এমএম পিস্তল উদ্ধারের অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে পুলিশের প্রকাশিত বিবরণে পিস্তলটির উল্লেখ নেই বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় বাকি এক লাখ পিস ইয়াবা ও কথিত পিস্তলের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। অভিযোগের তীর বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই গোলাম কিবরিয়াসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের দিকে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশের বক্তব্যে ৫০ হাজার ইয়াবা
প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী জোড়া ব্রিজের পশ্চিম পাশে একটি অস্থায়ী চেকপোস্টে অভিযান চালিয়ে ছৈয়দুল বশর নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। এ সময় একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ।
পুলিশের বিবরণ অনুযায়ী, অটোরিকশার চালকের আসনের নিচে রাখা একটি বস্তার ভেতরে পাঁচটি কার্টনে ইয়াবাগুলো পাওয়া যায়। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা কয়েকজনের বক্তব্যের সঙ্গে উদ্ধার করা মাদকের পরিমাণের এই হিসাব মিলছে না।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি দেড় লাখ পিস
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ওই অভিযানে ৫০ হাজার নয়, দেড় লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল। তাঁদের দাবি সত্য হলে পুলিশের প্রকাশিত হিসাবের সঙ্গে এক লাখ পিস ইয়াবার পার্থক্য তৈরি হয়।
কিন্তু উদ্ধার করা মাদকের প্রকৃত পরিমাণ কত ছিল, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন মামলার এজাহার, জব্দতালিকা, উদ্ধার করা মাদক গণনার নথি এবং থানার মালখানায় জমা দেওয়ার হিসাব। এসব নথি যাচাই ছাড়া অতিরিক্ত এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
পিস্তল উদ্ধার নিয়েও প্রশ্ন
ইয়াবার পাশাপাশি একটি নাইন এমএম পিস্তল উদ্ধারের দাবিও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, অস্ত্রটি উদ্ধারের পরও পুলিশের প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এর উল্লেখ নেই।
অস্ত্রটি সত্যিই উদ্ধার হয়ে থাকলে সেটি কোথায় জব্দ করা হয়েছে, কার কাছ থেকে পাওয়া গেছে, জব্দতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কি না এবং এ বিষয়ে কোনো পৃথক মামলা হয়েছে কি না, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, পিস্তল উদ্ধারের দাবির পক্ষে এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
এসআই কিবরিয়াসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে বালুখালী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই গোলাম কিবরিয়া, এএসআই সজিবুল ইসলাম ও কনস্টেবল মোহাম্মদ সুজনের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে উদ্ধার করা ইয়াবার পরিমাণ নিয়ে গরমিল এবং পিস্তল জব্দের বিষয়ে অসংগতি থাকার বিষয়ও রয়েছে।
কিছু প্রতিবেদনে হিসাবের বাইরে থাকা ইয়াবা মাদক কারবারিদের কাছে বিক্রি এবং পিস্তল জব্দ না করার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারণ করতে হবে।
তদন্তের কথা জানিয়েছে ঊর্ধ্বতন পুলিশ
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান জানিয়েছেন, ঘটনার সময় তিনি ছুটিতে ছিলেন। এমন ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. অহিদুর রহমানও বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না, তদন্তের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত কী অগ্রগতি হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন
মাদকবিরোধী অভিযানে উদ্ধার করা আলামতের হিসাব নিয়ে এমন অভিযোগ ওঠায় কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে।
প্রথমত, উদ্ধার করা ইয়াবার প্রকৃত পরিমাণ কত ছিল এবং গণনার সময় কারা উপস্থিত ছিলেন?
দ্বিতীয়ত, প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি করা দেড় লাখ পিস ইয়াবার সঙ্গে পুলিশের হিসাবের পার্থক্য কেন?
তৃতীয়ত, পিস্তল উদ্ধারের দাবি সত্য হলে অস্ত্রটি জব্দতালিকা ও মামলার নথিতে রয়েছে কি না?
চতুর্থত, অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হচ্ছে কি না এবং তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে উদ্ধার অভিযান-সংশ্লিষ্ট নথি, জব্দতালিকা, মালখানার রেকর্ড এবং ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযোগে নাম আসা পুলিশ সদস্যদের বক্তব্য নেওয়াও জরুরি।
মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অভিযানে উদ্ধার করা আলামতের স্বচ্ছ হিসাব ও জবাবদিহিও অপরিহার্য। উখিয়ার এই ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করা হলে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের জবাব পাওয়া সম্ভব হবে।
দৈনিক আলোকিত উখিয়া এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং তদন্তের অগ্রগতি জানার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
আরো পড়ুন
উখিয়া উপজেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটি অনুমোদন, সভাপতি রিদুয়ানুর রহমান, সম্পাদক জিয়াউল করিম রিয়াদ
উখিয়ার ইনানীতে নলকূপ খননকালে গ্যাসের উদগীরণ, আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস
ইনানীতে পাঁচতলা ভবনে উচ্ছেদ অভিযান, মাঠে কউক ও উখিয়া প্রশাসন