উখিয়ায় জমি নিয়ে বিরোধে নতুন মোড়, পূজা বন্ধের হুমকির অভিযোগ

২৫ শতক জমি নিয়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি দাবি, প্রশাসনের মধ্যস্থতার পরও বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি

উখিয়া প্রতিনিধি: কক্সবাজারের উখিয়া বাজারের দারোগা বাজার কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানসংলগ্ন জমি নিয়ে বিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিরোধপূর্ণ জমির সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, চলাচলের পথ এবং আসন্ন পূজা উদ্‌যাপনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সম্প্রতি রতন গংদের আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, মুন্সি পরিবারের কাছ থেকে তাঁদের দাবিকৃত জমি উদ্ধার করা না হলে আসন্ন পূজা উদ্‌যাপন করা হবে না। এ বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে স্মারকলিপি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে পূজা বন্ধের হুমকির অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রয়োজন।

প্রশাসনের মধ্যস্থতায় বৈঠক

বিরোধ নিরসনে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার এবং সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরীর উদ্যোগে দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে জানা গেছে।

বৈঠকে বিরোধপূর্ণ স্থানের আংশিক ভাঙা সীমানা প্রাচীর সংস্কারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি রতন গংদের দায়ের করা আপিল মামলার রায় বা ডিক্রি না হওয়া পর্যন্ত বিরোধপূর্ণ স্থানে কোনো পক্ষই অনুপ্রবেশ করতে পারবে না, এমন শর্তের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চুক্তি সম্পাদনে বিলম্বের অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে রতন গংদের পক্ষ থেকে অবশিষ্ট দেয়ালও সংস্কারের দাবি জানানো হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। দাবি পূরণ না হলে পূজা বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পরিস্থিতি পুনরায় প্রশাসনের নজরে এলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুন্সি পরিবারকে নিয়ে আবারও বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকে সরওয়ার জাহান চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে মুন্সি পরিবারের পক্ষ থেকে টিনের বেড়া দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় আসে।

পরবর্তী সময়ে মুন্সি পরিবারও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ও অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে।

২৫ শতক জমি নিয়ে বিরোধ

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিরোধপূর্ণ জমিটি বিএস ৭০২৯ নম্বর দাগের অন্তর্ভুক্ত এবং এর পরিমাণ আনুমানিক ২৫ শতক। জমিটির মূল মালিকানা জেলা প্রশাসকের নামে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জমির শ্রেণি পরিবর্তনসংক্রান্ত ১/৮৬-৮৭ নম্বর মামলায় জাকের মুন্সির নাম প্রস্তাব ও সুপারিশসহ জেলা প্রশাসকের অনুমোদন পাওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমোদন, বন্দোবস্ত, দখল এবং আইনগত মালিকানা এক বিষয় নয়। শ্রেণি পরিবর্তনের নথি থাকলেই জমির চূড়ান্ত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট খতিয়ান, বন্দোবস্তের আদেশ, দলিল এবং আদালতের রায় যাচাই করা প্রয়োজন।

জমিটির আশপাশে দুই পক্ষের দখল ও চলাচলের পথ নিয়েও বিরোধ রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে কে কতটুকু জমি দখলে রেখেছে এবং কোন অংশের ওপর কার আইনগত অধিকার রয়েছে, তা ভূমি রেকর্ড ও সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

আদালতের সিদ্ধান্তই হোক বিরোধ নিষ্পত্তির ভিত্তি

বিরোধপূর্ণ জমি নিয়ে মামলা বিচারাধীন থাকলে আদালতের আদেশ ও প্রযোজ্য আইন মেনেই উভয় পক্ষকে চলতে হবে। কোনো পক্ষের দাবিকে আগাম চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া যেমন সমীচীন নয়, তেমনি আদালতের কার্যকর আদেশ অমান্য করার অভিযোগ থাকলে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: জমিটির বর্তমান আইনগত অবস্থান কী? শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমোদনের পর বন্দোবস্তের চূড়ান্ত অবস্থা কী হয়েছে? বিরোধপূর্ণ স্থানের সীমানা নির্ধারণে সরকারি জরিপ হয়েছে কি না? আদালতের কোনো কার্যকর আদেশ থাকলে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না?

ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে কোনো পক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে এবং পূজা উদ্‌যাপনকে জমির বিরোধের সঙ্গে শর্তসাপেক্ষে যুক্ত না করে বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অধিকার, উভয় পক্ষের আইনগত অধিকার এবং এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা জরুরি।

দারোগা বাজারের এই বিরোধে শেষ পর্যন্ত কার দাবি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য, তা নির্ধারিত হওয়া উচিত নথিপত্র, ভূমি রেকর্ড ও আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে, কোনো পক্ষের চাপ বা আবেগের ভিত্তিতে নয়।